দেশের অন্যতম আমিষের উৎস মিঠাপানির মাছ চাষে নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের খামারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় মাছের শরীরে ও পুকুরের তলদেশের পলিতে এই ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এতে জলজ পরিবেশের মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্কস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে ত্রিশালের ২৫টি পুকুর থেকে রুই, কাতলা, পাঙাশ, মৃগেল, কমন কার্প ও সরপুঁটি—এই ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় এসব মাছের পরিপাকতন্ত্রে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রজাতিভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হারে ভিন্নতা দেখা গেছে। সরপুঁটিতে গড়ে সবচেয়ে বেশি (১.২০টি) কণা পাওয়া গেলেও শতাংশের হিসেবে পাঙাশে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ এবং রুইয়ে ৩৬ শতাংশ নমুনায় প্লাস্টিক কণা মিলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাছের বসবাসের স্তর ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পুকুরের তলদেশে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক কণা গ্রহণের হার ৫২ শতাংশ, যেখানে পানির উপরিভাগের মাছের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৩ শতাংশ। আবার সর্বভুক মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার ৫৮ শতাংশ এবং তৃণভোজী মাছের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ পাওয়া গেছে। এছাড়া পরীক্ষা করা প্রতিটি পুকুরের তলদেশের পলিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
মাছ ও পলিতে পাওয়া প্লাস্টিকের রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিকার্বনেট ও পলিইথিলিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, মাছের খাবারের প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্যাকেজিং, মাছ ধরার নাইলন ও পলিয়েস্টারের জাল, পুকুরের পাড়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ত্রিপল এবং সেচকাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপের ক্ষয় থেকে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে। এসব কণা পুকুরের তলদেশে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ সৃষ্টি করছে।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান খান জানান, গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করা হলেও মানুষের খাওয়ার উপযোগী পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। ফলে এই মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা প্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তিনি মাছের খামারে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যসূত্র: বিডি২৪ লাইভ
Reporter Name