আজ ৯ আষাঢ়, ১৪২৮, ২৩ জুন, ২০২১

গাইবান্ধার চরাঞ্চলে উচ্চ ফলনশীন কাউনের চাষ হচ্ছে

গাইবান্ধায় কাউনের বাম্পার ফলনে কৃষক হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে

খোঁজ খবর রিপোর্ট: দরিদ্র মানুষের খাদ্যশস্য হিসেবে অতি পরিচিতি কাউন চাষ প্রায় বিলুপ্তির পথে| তবে গাইবান্ধায় আবারও নতুন করে উচ্চ ফলনশীল বারী-২ জাতের কাউন চাষ করা হচ্ছে। গাইবান্ধা কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের তত্ত্বাবধানে নতুন উদ্যমে জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা বালু চরে ব্যাপকভাবে কাউন চাষ করেছেন কৃষকরা।

এ বছর কাউনের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষক হারানো দিনের ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছেন। এক সময় গাইবান্ধার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় নদী ভাঙন আর বন্যার কারণে দরিদ্রসীমার নীচে ছিল চরাঞ্চলের মানুষের বসবাস। সে সময় এই এলাকাকে মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল বলা হতো। কাউনের চালের ভাত, পায়েস ও পান্তা খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো চরাঞ্চলের মানুষ।

তখন চরাঞ্চল জুড়েই ছিল শুধু বালু আর বালু, এখানে কোনো ফসল হতো না, কিছু কিছু জমিতে কেবল কাউনের আবাদ হতো। চরের মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র ভরসাই ছিল কাউনের আবাদ করা আর নদীতে মাছ ধরা। বর্তমানে কাউন এখন আর দরিদ্র মানুষের খাবার নয়, কাউনের চালের পিঠা, পায়েস ও মোয়াসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী গ্রাম বাংলার পাশাপাশি শহরের মানুষের সখের খাবারে পরিণত হয়েছে।

এর আগে দেশি জাতের কাউনের ফলন কম হওয়ায় দিন দিন কাউনের আবাদ সারাদেশের ন্যায় গাইবান্ধার চরাঞ্চল থেকেও হারিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু বর্তমান কৃষি গবেষণায় নতুন উদ্ভাবিত বারী কাউন-২ জাতের বাম্পার ফলন হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষক এখন আবার কাউন চাষে ঝুঁকে পড়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি গবেষণা ইন্সটিউটের সূত্রানুসারে, চলতি বছর সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলে কাউনের আবাদ প্রায় ৭০০ বিঘা ছাড়িয়ে গেছে। সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদী বেষ্টিত চিনিরপটল, কুমারপাড়া, কালুরপাড়া, হলদিয়া, কানাইপাড়া, গাড়ামারা, দীঘলকান্দি ও পাতিলবাড়িসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের কৃষকরা নতুন উদ্যোমে কাউন চাষ শুরু করেছেন।

গাইবান্ধার চরাঞ্চলে উচ্চ ফলনশীন কাউনের চাষ

একই অবস্থা সাঘাটা উপজেলার কানাইপাড়া চরের কৃষক আবুল হোসেন জানায়, চরের একজন কৃষক ১৫ থেকে ২০ বিঘা পর্যন্ত জমি কাউনের চাষ করে থাকে। এর আগে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা ব্যয়ে দেশী জাতের কাউনের আবাদ করে প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ মণ কাউন ফলন হতো। ফলনও কম, বাজারে দামও ছিলো অনেক কম। ফলে কাউন চাষে তেমন লাভ না হওয়ায় দিনদিন কাউন চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ছিল কৃষকরা।

বর্তমানে একই পরিমাণ টাকা ও শ্রম খরচ করে বারী কাউন-২ জাতের প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন হয় ১০-১২ মণ। প্রতি মণ কাউন বাজারে বিক্রি হয় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। খরচও কম, লাভও বেশী। বাজারে চাহিদাও বেশি। এ কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাউনের আবাদ নতুন উদ্যোমে শুরু করেছেন চরের এসব কৃষক।

এরইমধ্যে চলতি মৌসুমের কাউন কাটা মাড়াই শুরু হয়েছে। চরের উৎপাদিত এসব কাউন কোন বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না, ব্যবসায়িরা কৃষকের বাড়ি থেকে ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছে। কাউনের বাম্পার ফলন ও দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকদের মুখে আনন্দের হাসি ফুটেছে।

গাইবান্ধা কৃষি গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল্যাহ আল মাহমুদ জানান, বিগত ৫ বছর ধরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনার উদ্ভাবিত বারী কাউন-২ সহ বিভিন্ন ধরণের ফসলের পরামর্শে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন উদ্ভাবিত জাতের শস্য বীজ ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে চরাঞ্চলের কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, কৃষিখাতকে আরও এগিয়ে নিতে গাইবান্ধা কৃষি গবেষণা বিভাগের চেষ্টায় গাইবান্ধার চরাঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমিতে উচ্চ ফলনশীল বারী জাতের ও স্থানীয় জাতের কাউনের চাষ হয়েছে। কাউনের ভালো ফলন হওয়ায় আগামীতে এই খাদ্য শস্যদের আবাদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর