আজ ২৬ বৈশাখ, ১৪২৮, ৯ মে, ২০২১

দাদন ব্যবসায়ি মাসুদ রানা

গাইবান্ধায় ব্যবসায়ীকে হত্যা: দাদন ব্যবসায়ীর ৪ দিনের রিমান্ড মনজুর

খোজঁ খবর রিপোর্ট: গাইবান্ধায় দাদনের টাকার জন্য জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলীকে (৪৫) হত্যার অভিযোগে শনিবার রাতে সদর থানায় লিখিত এজাহার দেন নিহতের স্ত্রী বিথী বেগম। এজাহারটি আজ বিকেল ৫টার দিকে দন্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। আজ রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে রেকর্ড করেছে গাইবান্ধা সদর থানা। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আওয়ামী লীগ নেতা ও দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানাকে চারদিনের রিমান্ড মনজুর করেছেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম। সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে ওই আদালতে রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান মামলা গ্রহন ও রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 এদিকে থানা থেকে পুলিশ দাদন ব্যবসায়ীর হাতে নিহত হাসান আলীকে তুলে দেওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। অপরদিকে ব্যবসায়ী হত্যার বিচারের দাবিতে আজ রোববার দুপুরে মানববন্ধন করে গাইবান্ধাবাসি। গতকাল এশার নামাজ শেষে গাইবান্ধা গোরস্থান জামে মসজিদে নিহত হাসান আলীর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গাইবান্ধা পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহত হাসান আলী (ফাইল ছবি)

স্বামী হত্যার অভিযোগে থানায় মামলার: নিহত ব্যবসায়ী হাসান আলীর স্ত্রী বিথী বেগম স্বামীর দাফন কাজ শেষ করে গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে গাইবান্ধা সদর থানায় হাজির হয়ে স্বামী হত্যার লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানাসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অপর দুইজন হচ্ছেন শহরের স্টেশন রোডের জুতা ব্যবসায়ী রুমেল হক ও খলিলুর রহমান ওরফে বাবু মিয়া। বিথী বেগম মামলার বিবরণে উল্লেখ করেন, গাইবান্ধা জেলা শহরের স্টেশন রোডে আমার স্বামীর আফজাল সুজ নামের জুতার দোকান রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানা (৪২) একজন দাদন ব্যবসায়ী। ব্যবসা চলাকালে আমার স্বামী মাসুদ রানার কাছে দেড় লাখ টাকা দাদন নেন। এই টাকা সুদাসলে বর্তমানে ১৯ লাখে দাড়িয়েছে বলে দাবি করেন মাসুদ রানা। সম্প্রতি মাসুদ রানা সুদের টাকার জন্য আমার স্বামী হাসান আলীকে চাপ দেন। এক পর্যায়ে গত ৫ মার্চ সকালে লালমনিরহাটের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে আমার স্বামীকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে আসেন মাসুদ রানা। তিনি তাকে গাইবান্ধা শহরের খানকা শরীফ সংলগ্ন নারায়নপুর এলাকায় নিজ বাসায় আটকে রাখেন।

এরপর টাকা নিয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে মাসুদ রানার তর্কবিতর্ক হয়। টাকার জন্য তিনি আমার স্বামীকে মানষিক ও শারীরক নির্যাতন এবং নানা ধরণের হুমকি দেন। এসব নির্যাতনের কথা মোবাইল ফোনে জানতে পেরে আমি স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় স্বামীকে উদ্ধারের চেষ্টা করি। স্বামীকে উদ্ধারের জন্য ওই বাড়িতে যাই। কিন্তু টাকা না দিলে মাসুদ রানা আমার স্বামীকে ছেড়ে না দিয়ে বড় ধরণের ক্ষতি করবে বলে হুমকি এবং আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।

ওইদিন সন্ধ্যায় আমি স্বামীকে উদ্ধারের জন্য গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করি। পরে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর রহমান ও উপ-পরিদর্শক মোশারফ হোসেন এবং একজন অজ্ঞাত পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ রানার বাড়ি থেকে আমার স্বামীকে সদর থানায় নিয়ে আসেন। একইদিন রাতে আমাদের উপস্থিতিতে পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর রহমান আমার স্বামীকে আমার জিম্মায় না দিয়ে মাসুদ রানার পক্ষ গ্রহন করেন। তিনি মাসুদ রানার টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং আমাকে ননজুডিশিয়াল স্টাম্পে অঙ্গিকারনামায় স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি তাতে সম্মত না হলে পরিদর্শক মজিবর আমার স্বামীকে মাসুদ রানার জিম্মায় দেয়। এরপর দলীয় ক্ষমতার দাপটে মাসুদ রানা আমার স্বামীকে একমাস আটকিয়ে রেখে পচন্ড শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন করতে থাকে। আমি অনেকভাবে চেষ্টা করেও আমার স্বামীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হই। অতপর শুক্রবার ৯ এপ্রিল রাতে আমার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করে বসতবাড়ির বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখে। পরদিন শনিবার সকালে আমি মাসুদ রানার বাড়িতে গিয়ে দেখি, তার টয়লেটে আমার স্বামীর লাশ ঝুলে আছে। তিনি বলেন, মাসুদ রানা ও তার সহযোগিরা পুর্বপরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে।

পুলিশ মাসুদ রানার হাতে হাসান আলীকে তুলে দেয়ার বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান বলেন, থানা চত্বরে শালিশ বৈঠকের পর হাসান আলী, তার স্ত্রী বিথী বেগম ও মাসুদ রানা সহ উভয়পক্ষের লোকজন থানা থেকে বেড়িয়ে যায়। এরপর তারা কি করেছে, পুলিশ তা জানে না।

বিচারের দাবিতে মানববন্ধন : জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলীকে টানা এক মাস ৬দিন আটকে রেখে হত্যার প্রতিবাদে গাইবান্ধায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। আজ রোববার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলা শহরের ডিবি রোডে আসাদুজ্জামান মার্কেটের সামনে গাইবান্ধাবাসির ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন নিহত হাসান আলীর স্ত্রী বিথী বেগম, ছোট ছেলে হেদায়েতুল ইসলাম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য আমিনুল ইসলাম, পরিবেশ আন্দোলন জেলা সভাপতি ওয়াজিউর রহমান, জেলা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মকছুদার রহমান, জেলা জাসদ সভাপতি গোলাম মারুফ, জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, সিপিবি জেলা সভাপতি মিহির ঘোষ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের জেলা সদস্য সচিব মনজুর আলম, উদীচী জেলা সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল গণি, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের জেলা সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা এই হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দাদন ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার শাস্তি এবং সদর থানার ওসি মাহফুজুর রহমান, সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবর রহমান উপ-পরিদর্শক মোশারফ হোসেনসহ ঘটনার সাথে জড়িতাদের শাস্তির দাবি জানান। মানববন্ধনে নিহতের স্ত্রী বিথী বেগম অভিযোগ করেন, শনিবার রাতে থানায় এজাহার দিতে গেলে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবর রহমান এজাহারে তার নাম বাদ দিতে বলেন।

পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন : সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। সম্মেলন পুলিশ সুপার বলেন, নিহত হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানার কোনো কর্মকর্তা জরিত কিংবা তাদের গাফলতি আছে কিনা তা তদন্তে শনিবার ঘটনার দিনই কমিটি করা হয়েছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মামলা গ্রহণে বিলম্ব করার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, আমাদের কাছে যে কেউ অভিযোগ দিতে পারে। তা আমরা যাচাই বাচাই করে গ্রহন করে থাকি। নিহতের স্ত্রী যে এজাহার দিয়েছেন তা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এজাহার থেকে নাম বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি : নিহত হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। কমিটির কর্মকর্তারা হচ্ছেন, আহবায়ক গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রাহাত গাওহারী, সদস্য গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) আবু খায়ের ও পুলিশ পরিদর্শক আবদুল লতিফ মিয়া। কমিটিকে আগামি সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জানতে চাইলে তদন্ত কিিটর সদস্য আবদুল লতিফ মিয়া বলেন, তদন্তের কাজ শুরু করা হয়েছে। যথাসময়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিস্কার : গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মাসুদ রানাকে কেন্দ্রিয় কমিটির নির্দেশে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। রোববার দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তাকে বহিস্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। মাসুদে বাড়ি থেকে ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তাকে বহিস্কার করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পিয়ারুল ইসলাম, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্দক আমিনুজ্জামান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক আবদুল লতিফ প্রমুখ।

এরআগে গত শনিবার দুপুরে গাইবান্ধা শহরের খানকা শরীফ সংলগ্ন নারায়নপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা ও দাদন ব্যবসায়ী(সুদের ব্যবসা) মাসুদ রানার বাসা থেকে হাসান আলীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর