আজ ১৩ আশ্বিন, ১৪২৮, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

রংপুর চিনিকলের আখচাষী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের চেয়ারম্যানও শোনালেন হতাশার বাণী

গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প সংস্থার (বিএসএফআইসি) ভুল সিদ্ধান্তের বলি গাইবান্ধার রংপুর চিনিকলের আখচাষী ও শ্রমিকরা বড় আশা করে পথ চেয়ে ছিলেন গত বৃহস্পতিবার দিনভর। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আসছেন তাদের বর্তমানের প্রকৃত অবস্থা পরিদর্শনে। সর্বোচ্চ মাড়াই সক্ষমতা সম্পন্ন কারখানা, সর্বোচ্চ সংখ্যক জমিতে দন্ডায়মান আখ রেখেও রহস্যজনক কারণে চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে চিনিকল বন্ধ হওয়া পর চাষীদের লোকসান কমিয়ে আখ ক্রয় বা চিনিকলটি পূন:রায় চালুর কোন আশাব্যঞ্জক সংবাদ শোনার আশায় তীর্থের কাকের মত বসে থাকার পর আবারও হতাশ হতে হলো তাঁদের। কিন্তু তিনি কাউকেই কোন আশার বাণী শোনাতে পারলেন না। সারাদিন অপেক্ষার পর সন্ধ্যায় এক প্রকার খালি হাতেই ফিরতে বাধ্য হলেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লোকসানের পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে চলতি মাড়াই মৌসুম শুরুর পূর্ব মূহুর্তে সংস্থার আওতাধীন ১৫টি চিনিকলের মধ্যে মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকলসহ ছয়টি চিনিকলে গত বছরের ২ ডিসেম্বর আখ মাড়াই বন্ধ ঘোষণা করে বিএসএফআইসি। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ চিনিকলের চেয়ে মাড়াই ও স্থান সক্ষমতায় কয়েক গুণ ছোট জয়পুরহাট চিনিকলে রংপুর টিনিকল ও শ্যামপুর চিনিকলে উৎপাদিত সমুদয় আখ মাড়াই হওয়ার কথা। কিন্তু ওই চিনিকল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা ও মাড়াই অক্ষতার কারণে প্রতিদিন সাতশ’ মেট্রিক টন হিসেবে গত ১২ দিনে ৮ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন আখের স্থলে সেখানে পাঠানো আখের পরিমাণ মাত্র ৫ হাজার মেট্রিক টন। রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান দুলাল অভিযোগ করে বলেন, সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে শুধুমাত্র এ চিনিকলের আখ পরিবহণে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে সাত থেকে আট কোটি টাকা। অথচ রংপুর চিনিকলে এ মৌসুমে মাড়াই কার্যক্রম চালালে খরচ হতো তিন-চার কোটি টাকা। এরপরও এখান থেকে পাঠানো আখের ট্রাক নিয়মানুযায়ী জয়পুরহাট চিনিকলে ঢুকতে না দিয়ে বাইরে এক-দেড় দিন করে আটকে রাখায় আখ শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে চিনি আহরণের হার নামছে আশংকাজনক ভাবে। এতে লোকসানের পরিমাণ এবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।
রংপুর চিনিকলের আখচাষী নেতা আব্দুর রশিদ ধলু বলেন, ভৌগলিক ভাবে শ্যামপুর ও জয়পুরহাট চিনিকলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, সর্বাধিক মাড়াই ক্ষমতা সম্পন্ন কারখানা ও সর্বাধিক পরিমাণ আখ মজুত থাকার পরও রংপুর চিনিকলে রহস্যজনক কারণে বিএসএফআইসি মাড়াই বন্ধ করেছে। এতে শ্যামপুর থেকে প্রায় দুইশ’ কিলোমিটার এবং রংপুর চিনিকল থেকে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আখ পৌঁছাতে হবে জয়পুরহাট চিনিকলে। এতে আখের গুণগত মান যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি লোকসানের বোঝা বাড়ছে কয়েক গুণ। রংপুর চিনিকল মিলস গেচট ক্রয় কেন্দ্রের পরিবহণ ঠিকাদার রনজু মিয়া জানালেন, প্রতিদিন দুই ট্রিপ আখ পরিবহণের জন্য ভাড়া করা ট্রাক জয়পুরহাট চিনিকলে একবার আখ নিয়ে গিয়ে আনলোড করে ফিরে আসতে সময় লাগছে ৩৬ থেকে ৪০ ঘন্টা। জয়পুরহাট চিনিকল কর্তৃপক্ষ আনলোড করার জন্য ৫ জনের স্থলে একজন শ্রমিক দিয়ে আনলোড করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আখচাষী ফেরদৌস আলম অভিযোগ করেন, দেশের চিনির বাজারকে বেসরকারি রিফাইনারী মিল সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়ার এটি গভীর একটি ষড়যন্ত্র।
আখচাষী নেতা শামসুল হোদা বিএসসি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএসএফআইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের সাথে চাষীদের সমস্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি নেয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে জানান, চেয়ারম্যান মহোদয় আমাদের কোন আশার আলো দেখাতে পারেন নি। তিনি বরং আমাদের হতাশ করে বলেছেন, আখ এ দেশের আবহাওয়া উপযোগী ফসল নয়। একই হতাশা প্রকাশ করেছে রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দও।
চিনিকল গুলোর বর্তমান পরিস্ধিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএসএফআইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো: আরিফুর রহমান অপু রংপুর চিনিকল অতিথি ভবনে আখচাষী, শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সাথে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। এ সময় তিনি সংবাদ কর্মীদের জানান, প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য এসেছি। অতিরিক্ত লোকসান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছয়টি চিনিকলে আখ মাড়াই বন্ধ করা হয়েছে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বর্তমান কৃষি ও শিল্পবান্ধব সরকার এখানে বিকল্প শিল্প কারখানা গড়ে তুলবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর