আজ ৪ আষাঢ়, ১৪২৮, ১৮ জুন, ২০২১

পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় ও চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের গর্ভকরার মতো স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় ও চ্যালেঞ্জ আজ আত্মবিশ্বাসকে শক্ত ও মজবুত করে বাঙ্গালী জাতিকে বিশ্বের দরবারে মডেল হিসেবে দাড় করিয়েছে আজ। সকাল সাড়ে ১১টায় মাওয়ার কাছাকাছি পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর বসানোর চেষ্টা চলছিল ৪১তম স্প্যান। ভাসমান ক্রেনে ঝুলে থাকা স্প্যানের একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, অন্যদিকে চীনের পতাকা। টু-এফ নম্বরের ওই স্প্যানটির দিকেই তখন শত শত মানুষের নিষ্পলক চোখ। ট্রলার, ফেরি, স্পিডবোটে থাকা সাধারণ মানুষ, সংবাদকর্মী, সেতুর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা—এই বুঝি জোড়া লাগল। এভাবে কেটে গেল আধাঘণ্টা। অবশেষে দুপুর ১২টা ২ মিনিটে খুঁটির ওপর সফলভাবে বসানো হলো স্প্যানটি। সবার চোখে-মুখে তখন ফুটে উঠল অসাধ্য সাধনের আনন্দের আভা। পদ্মার এপারের সঙ্গে ওপারের সংযুক্ত হওয়ার উল্লাস চারদিকে। বৃহস্পতিবার এভাবেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু অবয়ব পেল। ইতিহাস তৈরি করল বাংলাদেশ। বিশ্ব দেখল নিজেদের টাকায় দেশের সবচেয়ে বেশি খরচের অবকাঠামো নির্মাণের পথে বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ।

দেশের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু নিছক একটি বড় সেতু নয়, এটি দুঃসাহসী একটি স্বপ্নের নাম। পরাক্রমশালী বিশ্বব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিজেদের টাকায়ই আমরা পদ্মা সেতু গড়ব।’ স্বল্পন্নোত একটি দেশের জন্য বিদেশি কোনো সাহায্য ছাড়াই ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপই ছিল। নিজেদের অর্থায়নে সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী যে আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার মূল অংশের বাস্তবায়ন হলো গতকাল। ৪১টি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর পুরো ৬.১৫ কিলোমিটারই দৃশ্যমান হলো। ইস্পাতের এই কাঠামোটি শুধু পদ্মার এপার-ওপারকে যুক্ত করল না, জাতীয় জীবনে যুক্ত করল একটি ঐতিহাসিক অর্জন। উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি সাহায্য নির্ভরতার বিপরীতে এই সেতু দেশের জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে থাকবে। এই অর্জন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বিদেশি সংস্থার ঋণ থেকে বেরিয়ে আসতে নিঃসন্দেহে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে শত বাধা অতিক্রম করে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান।’ পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরুতে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। বিশ্বব্যাংক এই সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলায় দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয় তাঁকে। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানো বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য একটি আনন্দের খবর। পদ্মা সেতু যে শত বাধার পরও বাস্তবায়িত হচ্ছে, আজ পদ্মা সেতুর নির্মাণ পূর্ণতার দিকে যাচ্ছে, এটা সবার জন্য খুশির খবর।’ তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ ছিল বিশ্বব্যাংকের একটা অজুহাত। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে তারা ছিল একটি পক্ষ। ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল আওয়ামী লীগের ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে যাতে পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত না হয়।’

সেতুর কাজ দেখতে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘পদ্মা সেতুতে সর্বশেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অহংকার ও গর্বের জায়গাটা অনেক উচ্চতায় চলে গেল। সমগ্র দুনিয়াকে দেখিয়ে দিলাম আমরা পারি।’

সর্বশেষ স্প্যান বসানোর পর পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) ও প্রকল্পের ব্যবস্থাপক দেওয়ান মো. আ. কাদের, ‘এরপর দ্বিতল এই সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো হয়ে গেলেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুক্রবার পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান স্থাপন করা হয়। তখন ছয় কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়। গত বুধবার রাতেই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর। ওই রাতেই স্প্যানটি ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের কাছাকাছি নেওয়া হয়।’

জানা যায়, বুধবার রাতে তিন হাজার ২০০ টন ওজনের ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে ভাসমান ক্রেনে করে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে নেওয়া হয়।  আজ সকাল ১০টার দিকে স্প্যানটি বসানোর কাজ শুরু হয়। স্প্যানটি বসাতে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো লেগে যায়। পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানোর ঐতিহাসিক ক্ষণটি স্বচক্ষে দেখতে ভিড় জমিয়েছিল নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা কেউ ট্রলার, কেউ স্পিডবোট, কেউবা ফেরিতে করে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে গেছে।

মূল সেতুর ৪২টি পিয়ার বা খুঁটির ওপর বসেছে ৪১টি স্প্যান। এর মধ্যে সেতুর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ২০টি আর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ২০টি স্প্যান বসানো হয়। আর একটি স্প্যান বসেছে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে।

১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সে সময় তারা সফল হয়নি। পরে ২০০৯ সালে আবারও ক্ষমতায় এসে এই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। সে সময় বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের প্রস্তাব দিলেও পরে তারা দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। যদিও সে অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণ হয়। দুর্নীতির অভিযোগেই তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জেল খাটেন তখনকার সেতুসচিব। এমন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে শেষ পর্যন্ত নকশা অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ অনেক বিশিষ্টজন, অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদীশাসন কাজের উদ্বোধন করেন দৃঢ় প্রত্যয়ের নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানো হয়।

মূল সেতু নির্মাণের কাজটি করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি (এমবিইসি) এবং নদীশাসনের কাজ করছে চীনের কম্পানি সিনোহাইড্রো করপোরেশন। সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।

অনেকেই সেতু দেখতে সঙ্গে স্ত্রী, কন্যা ও শিশুপুত্রকে নিয়ে এসেছেন। তাদের কথা ‘এই পদ্মায় এমন ঢেউ আর স্রোত যে এতে অনেক মানুষ মারা গেছে। বাপ-দাদার কাছে পদ্মার প্রমত্তা রূপের নানা গল্প শুনেছি। আজ সেই নদীর ওপর দিয়ে ব্রিজ হচ্ছে। সর্বশেষ স্প্যানটিও আজ বসে গেল। আমাদের পদ্মাপারের মানুষের মাঝে ভিন্নরকম এক আনন্দ কাজ করছে। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’ সে জন্য পরিবার নিয়ে অনেকেই ব্রিজটা দেখতে আসেন।

পদ্মা সেতু রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে। যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। সব কাজ শেষ করার পর সেতু দিয়ে যানবাহন চলতে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে রেল সংযোগের কাজে আরো সময় লাগবে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর