আজ ৫ কার্তিক, ১৪২৭, ২১ অক্টোবর, ২০২০

নিলফামারী-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ নানা জটিলতায় থমকে গেছে।

নিলফামারী প্রতিনিধি: জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় থেমে গেছে নীলফামারী-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ। সাড়ে ১৫ কিলোমিটারের সড়কটির উন্নয়ন কাজের প্রথম দফার মেয়াদ শেষে দুই দফা সময়ে দুটি বছর পেরিয়ে আর মাত্র বাকি আছে নয় মাস। এ সময়ে কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫০ ভাগ। এমন অবস্থায় জেলা শহর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচলের একমাত্র সড়কটিতে দূর্ভোগের শিকার পথচারী ও যানবাহন চালক।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বলা হচ্ছে- ক্ষতিপুরণের টাকা না পাওয়ায় জমি ছেড়ে দিচ্ছেন না জমির মালিকরা। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, জমি অধিগ্রহনের চারটি অংশের মধ্যে তিনটি অংশের টাকা বুঝে দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছে। অপরদিকে জেলা প্রশাসন বলছে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপুরণ প্রদানের প্রস্তাবনা তৈরীতে কিছু ত্রুটি আছে, যেগুলো সংশোধনে সময় লাগছে।

জমি ও স্থাপনার মালিকরা বলছেন, প্রায় দুই বছর ধরে তাদের অধিগ্রহণ করা জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপুরনের টাকা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় তারা তাদের জায়গায় কাজ করতে বাধা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর আগে তারা সড়ক অবরোধ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন।

সড়ক বিভাগ জানায়, সাড়ে ১৫ কিলোমিটারের নীলফামারী-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহা সড়কটি ১৮ ফিট থেকে ৪২ ফিট প্রসস্ত করণে ২০১৭ সালে ২২৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। দরপত্র গ্রহন শেষে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট এক বছরের সময় নির্ধারণ করে দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ২০১৮ সালের ২ আগষ্ট কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সড়ক সম্প্রসারণে ৫৪ দশমিক ৬১৫ একর জমি অধিগ্রহনে জেলা প্রশাসনকে ওই বছরের জানুয়ারী মাসে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, বনবিভাগ ও গণপূর্ত বিভাগের সমন্বয়ে সড়কের প্রয়োজনীয় জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণে চারটি অংশে বিভক্ত করে অধিগ্রহণের কাজ শুরু করা হয়। এরই মধ্যে ওই চার অংশের মধ্যে তিনটি অংশের অধিগ্রহনের অর্থ সড়ক বিভাগ বুঝে দেয় জেলা প্রশাসনকে। জেলা প্রশাসন একটি অংশের জমি মালিকদের ক্ষতিপুরণের অর্থ প্রদান করলেও নানা জটিলতায় আটকে যায় বাকি দুটি অংশের টাকা প্রদানের কাজ। অপর অংশ শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে কালিতলা পর্যন্ত মাঠ পয়ায়ের কাজ শুরু হয়নি করোনার প্রভাবের কারণে।

জেলা সদরের চড়াইখোলা ইউনিয়নের দারোয়ানী পিলার বাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৪৫) বলেন, “দুই বছর আগে কাজ শুরু হলে আমাদের দোকনপাট ভেঙে কাজ শুরু করেন। সে থেকে আমরা ক্ষতি পুরণের টাকার জন্য ঘুরছি। এক বছর আগে ক্ষতিপুরণের টাকার টাকার দাবিতে আমরা মানবন্ধন করলে জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছিল ১৫ দিনের মধ্যে টাকা দেওয়া হবে। এরপর একাধিকবার আমরা জেলা প্রশাসনে যোগাযোগ করেছি। আড়াই মাস আগে টাকা আসার কথা শুনে আমরা জেলা প্রশাসনে যোগাযোগ করলে বলা হয়েছিল ‘টাকা দেওয়া হবে, ১৫ দিনের মধ্যে আপনাদের কাছে গণপূর্ত, বিভাগ এলএ শাখা, বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট ভিাগের লোকজন যাবে। ওই ১৫ দিনের স্থলে দুই মাস পার হলেও কোন খবর নেই।”

একই বাজারের ব্যবসায়ী সামাদুল আলম (৫৫) বলেন,“দুই বছর আগে আমাদের দোকান না ভাঙলে ঠিকাদার কাজ শুরু করতে পারছেন না। সেময় বলেছিল অল্প সময়ের মধ্যে আপনারা ক্ষতিপুরণের টাকা পাবেন। দীর্ঘ সময়েও টাকা না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পরিবার নিয়ে পথে বসেছেন। টাকা পেলে তারা বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারতেন। এখন টাকা এসেছে, কিন্তু ডিসি পুণরায় দেখে টাকা দিবেন বলে আমাদেরকে জানিয়েছেন।”

এদিকে জমির দাম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে ৪৪৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। যার মধ্যে ভূমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণ ব্যয় ধরা হয় ৩১৩ কোটি টাকা।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্সের প্রতিনিধি মো. কামরুল ইসলাম বলেন,“আমরা জমি মালিকদের বুঝিয়ে তাদের জায়গায় কাজ শুরু করেছিলাম। এখন দীর্ঘ সময়েও ক্ষতিপুরণ না পাওয়ায় কাজে বাধা দিচ্ছেন। ফলে গত জুন মাস থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। এমন সমস্যায় একটি অংশের ঠিকাদার নাভানা বিল্ডার্স চুক্তি বাতিল করে চলে গেছেন। দ্রুত সমাধান না হলে আমাদেরকেও কাজ ছেড়ে চলে যেতে হবে।”

জেলা শহরের গাড়ি চালক ইস্তাম্বুল ইসলাম (৪৫) বলেন,“জেলা শহর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটির দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার কাজ চলছে। শেষ না হওয়ায় ভাঙা সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে। এতেকরে যানবাহনের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি সময় অপচয় হচ্ছে।”

নীলফামারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম বলেন, “ভূমি অধিগ্রহনের জন্য সড়কটিকে চারটি অংশে বিভক্ত করা করা হয়। এরই মধ্যে তিনটি অংশের বিপরীতে জেলা প্রশাসনকে ২৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। একটি অংশের প্রক্কলন এখনও পাইনি। সেটি পেলে তাদের চাহিদামত টাকা দেওয়া হবে।”

তিনি বলেন,“জেলা প্রশাসন একটি অংশের অধিগ্রহণ নিস্পত্তি করে জায়গা বুঝে দিয়েছেন। ওই অংশের কাজ শেষ হয়েছে। বাকী তিনটি অংশ নিস্পত্তি না হওয়ায় ঠিকাদার কাজ করতে পারছেন না। এরই মধ্যে দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাভানা কনস্ট্রাাকশন নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিঠি দেয়। আমরা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে তাদের চুক্তিপত্র বাতিল করে ওই অংশে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করেছি।

বর্তমানে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নাভানা, রানা বিল্ডার্স ও ইসলাম ব্রাদার্স নামে জয়েণ্ট ভেন্সারে সাড়ে সাত কিলোমিটারের কাজ করছেন। সেটিও জায়গা বুঝে না পাওয়ার কারণে গত জুন মাস থেকে কাজ বন্ধ রেখেছেন।”

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন,“অধিগ্রহণের কাজটি শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে নতুন গেজেট হলে নতুন আইন ধরে ক্ষতিপুরণের টাকা দেওয়ার চুড়ান্ত প্রাক্কলন করা হয়। এ নিয়ে প্রকল্পের শুরু থেকে একটি জটিলতা শুরু হয়েছিল। এই জটিলতায় ২০১৯ সালের ডিম্বের মাস পর্যন্ত সময় চলে গেছে। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে রিভাইস পিপি হয়ে টাকাটা আমাদের কাছে এসেছে।

এরপর যখন আমরা জনগণকে এই ক্ষতিপুরণটা দিব, তখন দেখা গেল এটি প্রস্তুতের সময় (প্রস্তাবনা) কিছু ভুলক্রটি রয়েগেছে। আইনে বলা আছে ভুল যখনই জেলা প্রশাসকের গোচরীভুত হবে, তখনই সংশোধন করে চেক প্রদান করতে হবে। সে অনুযায়ী জেলা প্রশাসন, প্রত্যাশী সংস্থা, গণপূর্ত বিভাগ, বনবিভাগকে যুক্ত করে কাজ করছি আমরা। একটা সিস্টেমে কাজ সম্পন্ন করতে হবে, সে অনুযায়ী আমরা আগাচ্ছি। ইতিমধ্যে ভূমিমন্ত্রনালয়ে এ বিষয়ে একটি পত্র প্রেরণ করেছি। সব পেলে এ বছরেই কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”

তিনি জানান, ওই সড়কের জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহনে চারটি ভাগ করা হয়েছে। যার মধ্যে একটি অংশের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে জায়গা বুঝে দেওয়া হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে একটি অংশের মাঠ বই তৈরী করা যাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর