আজ ৮ আষাঢ়, ১৪২৮, ২২ জুন, ২০২১

২৫টি দেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় করোনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ

খোঁজ খবর ডেস্কঃ  চীনে নতুন করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩১ জনে। এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। উহানের ‘হুইসেলব্লোয়ার’ ডাক্তার লি ওয়েনল্যাং নামে ৩৪ বছর বয়সী যে চিকিৎসক সর্বপ্রথম এ ভাইরাসের বিপদ নিয়ে সতর্ক করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের তোপের মুখে পড়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা গেছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর লি এক বার্তায় প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে তার সহকর্মীদের সতর্ক করেন। এর পরপরই চীনা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, সামাজিক শৃঙ্খলায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী মিথ্যা মন্তব্য করার কাজ অব্যাহত রাখলে আপনাকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তবে তার মৃত্যুর পর পিপলস ডেইল জানায়, ড. লির মৃত্যুতে পুরো চীন জাতি শোকাহত।

এদিকে, বিশ্বের ২৫টি দেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় করোনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের পারদ নামছে না কিছুতেই। এ উদ্বেগের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ধরণের গুজব বা ফেইক নিউজ। এখানে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অদ্ভুত সব কারণ উল্লেখের পাশাপাশি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের প্রচারে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। এ ছাড়া করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য প্রচারের আগে সেটা ভালোভাবে যাচাই করে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোথাও বলা হচ্ছে রসুন, লবঙ্গ, আদাজল খেলে করোনা ভাইরাস ভালো হয়। এ নিয়ে অনেকে বিভিন্ন ওষুধের বিজ্ঞাপনও প্রচার করছেন যেগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা এখনো আবিষ্কার হয়নি।

এদিকে, ভারতের শীর্ষ মিডিয়া আনন্দবাজার তাইওয়ানের একটি সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে বলছে, চীনে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা ২৫ হাজার এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে দেড় লাখ। চীনা কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ির কারণে প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হচ্ছে না সবার পক্ষে। চীন বলছে, সেখানে গত বৃহস্পতিবার আরো ৭৬ জন মারা গেছে প্রাণসংহারী এ ভাইরাসে। চীনের বাইরে হংকং ও ফিলিপাইনে মারা গেছে আরো দুজন। দেশটির মূল ভূখণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ১৪৩ জনে। চীনের বাইরে আরো ২৫ দেশে আড়াইশর বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন এ ভাইরাসে। সিএনএন এর হিসাবে, গোটা পৃথিবীতে ৩১ হাজার ৪২০ জনের দেহে সংক্রমণ ঘটিয়েছে এ ভাইরাস।

ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে জাপানের ইয়োকোহামা এবং হংকং বন্দরে দুটি প্রমোদতরীর কয়েক হাজার যাত্রী ও ক্রুকে পর্যবেক্ষণের জন্য জাহাজেই অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে। ৩ হজার ৭০০ আরোহী নিয়ে ইয়োকোহামায় নোঙ্গর করে থাকা ডায়মন্ড প্রিন্সেসে ৬১ জনের দেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর ৩ হাজার ৬০০ আরোহী নিয়ে হংকং বন্দরের আটকে থাকা ওয়ার্ল্ড ড্রিমে আক্রান্ত হয়েছেন আটজন।

বেইজিং বলছে, করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ‘জনযুদ্ধ’ শুরু করেছে তারা। এ কাজে বিশ্বের সহায়তা চেয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোনে তিনি বলেন, নতুন এ করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সম্ভাব্য সব কিছুই করবে চীন। এ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার বিষয়ে চীন আত্মবিশ্বাসী।

বিধ্বংসী এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চীনের পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। আতঙ্কের কারণে বিভিন্ন দেশ চীনের সঙ্গে বিমান ও জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখায় বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজ মালিকরা বলছেন, চীনে বার্ষিক ছুটির মৌসুমে এমনিতেই পণ্য পরিবহনের চাহিদা কমে যায়। তার ওপর করোনা ভাইরাসের কারণে চীনা কারখানাগুলো অলস রাখায় জাহাজের চাহিদাও কমে গেছে। চাহিদা কমায় দাম পড়ে গিয়ে তেলের বাজার মন্দা পরিস্থিতির মধ্যে চলছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ থাকায় চীনে বন্যপ্রাণীর দেহ থেকে মানবদেহে ছড়িয়েছে এ ভাইরাস। এ কারণে বন্যপ্রাণী বাণিজ্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারা। যেসব বাজারে জীবিত বন্যপ্রাণী বিক্রি হয়, সেখান থেকে এ জীবাণু মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। চীনা কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা বন্ধ করলেও সংরক্ষণবাদীরা মনে করছেন, এটি যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের ৭০ শতাংশের বেশি ধরনের সংক্রমণই বিভিন্ন প্রাণী থেকে শুরু বলে ধারণা করা হয়। সার্স এবং মার্স ভাইরাসের পেছনে ছিল বাদুড়। মানবদেহে সংক্রমণের আগে সেগুলো বিড়াল এবং উটের দেহে ছড়িয়েছিল। বিশ্বে বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার। টাকার অঙ্কের হিসেবে মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের পরই এর অবস্থান।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ নিয়ে বিভিন্ন ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। বেইজিংয়ে জন্মদিন ও বিবাহ আয়োজনে অ্নেক মানুষের একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঝুঁকির তালিকায় থাকা শহরে যেসব পরিবার থাকেন, প্রতিদিন এসব পরিবারের কতজন সদস্য বাড়ি থেকে বের হতে পারবেন তা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। হুবেই প্রদেশের উঁচু উঁচু ভবনগুলোর লিফট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উহান শহরের এক প্রবীণ কর্মকর্তা জানান, জরুরি ভিত্তিতে দুটি হাসপাতাল নির্মাণ হলেও রোগীর মারাত্মক চাপ সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। উহান সরকার বাসিন্দাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থা বলছে, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার চেষ্টা চলছে।

ভাইরাস ঠেকাতে মাস্কের চাহিদা বাড়ছে চীনসহ গোটা বিশ্বে। চীন প্রতিদিন দুই কোটি মাস্ক উৎপাদন করে, যা পুরো বিশ্বের উৎপাদনের অর্ধেক। তবে এ মুহূর্তে সেই উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশটির অনলাইন শপিং সাইট টাওবাও জানায়, গত মাসে মাত্র দুদিনেই তারা আট কোটি মাস্ক বিক্রি করেছে। চীন সরকার এক সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২২ কোটি মাস্ক কিনেছে। মানসম্পন্ন মাস্ক উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্রের ‘৩এম’ বলছে বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে তারা উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কেমব্রিজ মাস্ক নামে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি জানায়, ব্যাপক চাহিদার কারণে তাদের সব মাস্ক বিক্রি হয়ে গেছে। তাছাড়া নিজেদের চাহিদা মেটাতে মাস্ক রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে তাইওয়ান ও ভারতের মতো বেশ কয়েকটি দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর